কেননা পররাষ্ট্রবিষয়ক কূটনীতিবিদ ও রাষ্ট্রদূত পেশা তাঁকে আকর্ষণ করত
যদিও তখন নারীরা এ পেশায় আসতে পারতেন না
ভালো ফলের মধ্য দিয়ে তিনি এ পেশায় আসতে চেয়েছিলেন
সারাক্ষণ শুধু পড়ার মধ্যে ডুবে থাকা
চেষ্টা-পরিশ্রম বিফলে যায়নি
এমএ পরীক্ষায় যুগ্মভাবে প্রথম হন
তবে এই ভালো ফলের পেছনে যাঁর উৎসাহ ছিল তিনি হলেন শামসুন নাহার মাহমুদ

পরিচয় থেকে পরিণয়
কামরুন্নেসা গার্লস স্কুলের সহপাঠীর ভাই মাইনুর রেজা চৌধুরী
পারিবারিকভাবেও তাঁরা একে অপরকে চিনতেন
সেই সম্পর্ক ঘনীভূত হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডিতে এসে
মাইনুর রেজা চৌধুরী তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ছাত্র
ছাত্রাবস্থায়ই পারিবারিক সম্মতিতে ১৯৬১ সালে তাঁদের বিয়ে হয়
নাজমা চৌধুরীর পথচলায় সাবেক প্রধান বিচারপতি মাইনুর রেজা চৌধুরীর অনেক সহযোগিতা ছিল
নাজমা চৌধুরী বলেন সব সময় আমার স্বামী বলতেন সব সময় আমি তোমার পাশে আছি
পেছন ফিরলেই আমাকে দেখতে পাবে
২০০৪ সালে তিনি মারা যান
এখনো গভীর রাতে ঘুম ভেঙে গেলে মনে হয় তিনি এসেছেন
হয়তো আছেন আমার আশপাশে
সারা জীবনে তাঁর সহযোগিতা না পেলে আমি হয়তো এ অবস্থায় আসতে পারতাম না
সন্তানদেরও প্রতিষ্ঠিত করাতে কষ্টকর হয়ে যেত

রাষ্ট্রবিজ্ঞান থেকে উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ
এমএ পরীক্ষার ফল বের হলো
ঠিক সেই সময় হঠাৎ রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের কয়েকজন শিক্ষক দেশের বাইরে চলে গেলেন
পদ শূন্য হলো
আমাকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান ডেকে পাঠালেন
স্বামী ও মা-বাবা উৎসাহ দিলেন শিক্ষকতা পেশা বেছে নিতে
বাবা যে কী খুশি হয়েছিলেন
সব জায়গায় আমার গল্প করতেন
গর্ববোধ করতেন আমাকে নিয়ে
বলেন নাজমা চৌধুরী
কিন্তু শাশুড়ির খুব একটা মত ছিল না
শাশুড়ির মতে বাড়ির বউ কেন চাকরি করবে এ সময় নানি-শাশুড়ির কুমিল্লার শিক্ষাব্রতী নবাব ফয়জুন্নেছার নাতনির নাতনি ছিলেন জোর সমর্থনে ১৯৬৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে অধ্যাপনায় যোগ দেন
কোলজুড়ে আসে প্রথম সন্তান লামিয়া চৌধুরী
নয় মাসের মেয়েকে রেখে কীভাবে পিএইচডি করতে যাবেন তাঁর মা তাঁকে সাহস জোগালেন
এদিকে স্বামী মাইনুর রেজা চৌধুরীও ব্যারিস্টারি পড়তে যাবেন বিলেতে
তাই স্বামী-স্ত্রী মিলেই পাড়ি জমালেন বিদেশে
কমনওয়েলথ বৃত্তি নিয়ে লন্ডন ইউনিভার্সিটির স্কুল অব ওরিয়েনটেল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজ থেকে তিনি পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন
পাঁচ বছরে একবার দেশে এসেছিলেন
তবে বিদেশে খুব কষ্ট হয়েছে
নিজের মেয়ের বয়সী কাউকে দেখলেই কান্না পেত
১৯৭২ সালে দেশে ফিরে আবার অধ্যাপনায় মন দেন
১৯৮৪-৮৭ সালে তিনি রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন
এ সময় তিনি রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে নারী উন্নয়ন ও রাজনীতি-সম্পর্কিত কোর্স প্রবর্তন করেন
নারীর বৈষম্যমূলক অবস্থান বিশ্লেষণের উদ্দেশে তিনি এসব বিষয়ে এমফিল ও পিএইচডি গবেষণায় উৎসাহিত করেন
তিনি এ বিষয়ে কয়েকজন সহকর্মীকে নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী-সম্পর্কিত গবেষণায় উৎসাহিত করার লক্ষ্যে সেন্টার ফর উইমেন স্টাডিজ প্রতিষ্ঠার প্রয়াস নেন
এর মধ্যে ১৯৮৮ সালে ফুল ব্রাইট ফেলোশিপের অধীনে যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটা বিশ্ববিদ্যালয়ে তিন মাস ভিজিটিং স্কলার হিসেবে শিক্ষকতার দায়িত্ব পালন করেন
সেখানে তাঁর একটি বিষয় ভালো লেগেছিল
সেখানকার শিক্ষার্থীরা সুশৃঙ্খলভাবে চিন্তা করতে পারেন
বইয়ের ভাষা বলেন না
নিজস্ব চিন্তাচেতনার জায়গাটা বেশ প্রখর
শিক্ষকের সঙ্গেও তাঁদের সম্পর্ক বন্ধুত্বপূর্ণ
সেখানে কোনো স্বার্থের বাধা নেই
তাঁদের নানা প্রচেষ্টার ধারাবাহিকতায় ২০০০ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগ প্রতিষ্ঠিত হয়
এটি ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং কাজ
কেননা সামাজিক রাজনৈতিক এমনকি ইতিহাসেও নারীর ভূমিকা সেভাবে প্রস্ফুটিত হতো না
নারীর উন্নয়ন তো জাতীয় উন্নয়নের অংশ
জেন্ডার সেনসিটিভিটি নিয়েও তেমন কাজ হতো না
আমাদের মনে হয়েছিল শুধু রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের মাধ্যমে এটি করা সম্ভব নয়
তাই আলাদা একটি বিভাগ চালু করার প্রয়োজন হয়ে পড়ে
এ সময় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাঁকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের পাশাপাশি উইমেন স্টাডিজ বিভাগের সভাপতির দায়িত্ব দেয়
২০০৩ সালে তিনি পুরোপুরি উইমেন স্টাডিজ বিভাগে অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন
পরবর্তী সময়ে এই বিভাগের চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন

বৈচিত্র্যময় কর্মজীবন
বারবারা জে নেলসন তাঁর পত্রবন্ধু
কেউ কাউকে দেখেননি
এরপর দুজন দুজনকে ছবি পাঠান
পরে তাঁদের দেখা হয়
মিনেসোটা বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকাকালে তাঁরা একটি বইয়ের কাজ পুরোদস্তুর করেন
৪৩টি দেশের নারীদের রাজনৈতিক অবস্থান ক্ষমতায়নের সমীক্ষা তাতে স্থান পায়
১৯৯৪ সালে বারবারা নেলসন ও নাজমা চৌধুরীর সম্পাদনায় যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল ইউনিভার্সিটি থেকে প্রকাশিত হয় উইমেন অ্যান্ড পলিটিকস ওয়ার্ল্ড ওয়াইড শীর্ষক গবেষণা বই
বেগম রোকেয়ার চিন্তাচেতনা ও বাংলাদেশের নারী আন্দোলন বিষয়ে ২০০৩ সালে রোকেয়া মেমোরিয়াল লেকচার হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলে তিনি বক্তৃতা দেন
এ ছাড়া তাঁর লেখা বিভিন্ন জার্নাল ও বইয়ে বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়ে প্রকাশিত হয়
বেইজিং চতুর্থ বিশ্ব নারী আন্দোলনের লক্ষ্যে বাংলাদেশের স্বেচ্ছাসেবী নারীদের সংগঠিত করা ও ফলাফল অর্জন করতে ১৯৯৩-৯৫ সালে বেসরকারি এনজিও ফোরামের চেয়ার ও সরকারের প্রিপারেটরি কমিটির প্রতিনিধি হিসেবে তিনি যোগ দেন
পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ সরকারের কর্মপরিকল্পনা তৈরির সার্বিক কাজে নেতৃত্ব দেওয়া ফলাফল অর্জন করা ও তা বাস্তবায়নের জন্য ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রথম নারী উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ পান
মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় সমাজকল্যাণ শ্রম ও জনশক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান
তবে নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক ইউনূসের পরামর্শে তিনি মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে বেশি কাজ করেন
বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে তিনি ১৯৭৮ ও ১৯৮৬ সালে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগ দেন
১৯৮০ সালে ইউনেসকোর সম্মেলনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন
এ ছাড়া ১৯৮৫ সালে নাইরোবি বিশ্ব নারী সম্মেলনে তিনি প্রতিনিধি হিসেবে ভূমিকা রাখেন
নাজমা চৌধুরী বিভিন্ন সংগঠন ও সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা এবং আজীবন সদস্য
উইমেন ফর উইমেনের সাবেক সভাপতি হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য তিনি

স্বীকৃতি ও সম্মাননা
২০০৭ সালে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন তাঁকে রোকেয়া চেয়ার সম্মাননায় ভূষিত করে
এর আগে ১৯৯৬ সালে গবেষক হিসেবে অন্যান্য শীর্ষ ১০ পুরস্কার লাভ করেন
তাঁর সম্পাদিত বই উইমেন অ্যান্ড পলিটিকস ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ১৯৯৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে প্রকাশিত শ্রেষ্ঠ প্রকাশনা হিসেবে আমেরিকান পলিটিক্যাল সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন কর্তৃক পুরস্কৃত হয়
২০০৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানজনক প্রফেসর ইমেরিটাস পদে উন্নীত হন
একই বছর দেশের অন্যতম সম্মানজনক পুরস্কার একুশে পদক-এ ভূষিত হন নাজমা চৌধুরী

জীবন এখন যেমন
গুলশানের বাড়িতে ছোট মেয়ের সঙ্গেই থাকেন তিনি
ছোট মেয়ে বুশরা হাসিনা চৌধুরী ও তাঁর স্বামী মো ওবায়দুল হক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক
তাঁদের সন্তান আবরাজ ও সানায়াকে ঘিরেই সময় কাটে তাঁর
তাদের দুষ্টুমিতেই তিনি আনন্দ খুঁজে পান
আগে গান শুনতে খুব পছন্দ করতেন
শারীরিকভাবে অসুস্থ থাকায় আজকাল তেমন একটা গান শোনা হয়ে ওঠে না
